কক্সবাজারে টানা ছয় দিনের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন্যার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার রামু, চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বর্তমানে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

বর্ষণজনিত পাহাড়ি ঢলের কারণে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ তলিয়ে গেছে, যার ফলে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

বাড়ছে প্রাণহানি, ঝুঁকিতে পাহাড়ের বাসিন্দারা
সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজকাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মোহাম্মদ ওয়াকিম নামের দুই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় তৌসিফ (১৪) ও রুমি আক্তার (১৭) নামের দুই চাচাতো ভাই-বোন প্রাণ হারান।

এ নিয়ে জেলায় পাহাড়ধসে ২০ জন এবং পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে ও ডুবে ৪ জনসহ মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে। নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।

উপচে পড়ছে নদী, ভাঙছে বেড়িবাঁধ
টানা বর্ষণে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে বিভিন্ন এলাকায় উপচে পড়ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাতামুহুরির কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুইত্যাখালী এলাকায় নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে তীব্র বেগে লোকালয়ে বানের পানি ঢুকে পড়ে। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান এলাকাগুলো:
রামু উপজেলা: গর্জনীয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল, চাকমারকুল ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি।
চকরিয়া উপজেলা: হারবাং, বরইতলী, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং চকরিয়া পৌরসভা।
মাতামুহুরী উপজেলা: বিএমচর, কোনাখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বদরখালী, ঢেমুশিয়া ও সাহারবিল।
পেকুয়া উপজেলা: বারবাকিয়া, রাজাখালী, মগনামা, শিলখালী ও উজানটিয়া।

চরম খাদ্য ও পানি সংকট, ক্ষোভ
বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনা খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকার গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্যোগের দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো ধরনের সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি।

প্রশাসন ও আবহাওয়া অফিসের বক্তব্য
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন: “দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। বর্তমানে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য খাদ্যসামগ্রী, চাল এবং নগদ ১০ লাখ টাকা মজুদ রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

এদিকে আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ৬ দিনে কক্সবাজারে রেকর্ড ৬৫০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, টানা বর্ষণ আরও অব্যাহত থাকতে পারে, যা বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা তৈরি করছে।

আরও খবর