চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে একটি সামরিক বিমানে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অভ্যর্থনার সারিতে সাদা টুপি, সাদা দাড়ির এক প্রবীণ ব্যক্তি। তিনি জামায়াতের নগর কমিটির সাবেক আমির শাহজাহান চৌধুরী।

বিমান থেকে নামার পর প্রধানমন্ত্রী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সেখানে নজর কাড়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর উপস্থিতি। করমর্দনের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘স্বাগতম’।

একই দিনে, একই বিমানবন্দরে একজন সংসদ সদস্য অভ্যর্থনা জানালেন দুজনকে। সকালে নিজের দলের প্রধান, যিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। সন্ধ্যায় দেশের প্রধানমন্ত্রী, যিনি সংসদে সরকারি দলের নেতা।

শাহজাহান চৌধুরী নতুন মুখ নন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) আসন আবারও জামায়াতের দখলে রাখেন তিনি। প্রচারের সময় কড়া বক্তব্যের জন্যও তিনি আলোচিত ছিলেন। তাঁর এক বক্তব্যের প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছিল পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, আর দলও তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল।

কড়া বক্তব্যের জন্য পরিচিত সেই মানুষটিই রাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে। এটাই ছবিটিকে আলাদা করেছে।

এখানে রাজনীতি খোঁজার সুযোগ নেই
ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে খালেদ চৌধুরী নামে একজন প্রশ্ন রেখেছেন, শাহজাহান চৌধুরী কি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাব মিলেছে শাহজাহান চৌধুরীর কাছেই। বাংলার পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে আমি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে রাজনীতি করা মানুষ। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামে আমরা একসাথে কাজ করেছি।’

পুরোনো এক স্মৃতিও টেনে আনেন তিনি। জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দীর্ঘ নয় বছর কারাগারে ছিলেন। প্রথম গ্রেপ্তারের খবর পেয়েই বেগম খালেদা জিয়া তাঁর পরিবারে ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন, সাহস দিয়েছিলেন।

‘তারই সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান। তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান নন, বাংলাদেশেরও প্রধানমন্ত্রী। আমার শহরে তাঁর আগমনে আমি তাঁকে স্বাগত জানাব, এটি স্বাভাবিক। এখানে রাজনীতি খোঁজার কোনো সুযোগ নেই।’

যাঁকে হারিয়ে এমপি, তিনিই বললেন “শতভাগ ইতিবাচক”
সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রতিক্রিয়াটি এসেছে এমন একজনের কাছ থেকে, যাঁর সমালোচনা করাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন। ভোটের মাঠের সেই প্রতিপক্ষ ঘটনাটিকে দেখছেন সংসদীয় রীতির চোখে।

বাংলার পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘তিনি একজন সংসদ সদস্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও একজন সংসদ সদস্য। সংসদ যেমন সরকারি দলের, তেমনি বিরোধী দলের। শুধু সরকারি দল নিয়ে তো আর সংসদ চলবে না।’

তাঁর মতে, বিরোধী দল সংসদ পরিচালনায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, দেশ পরিচালনাতেও তাদের ভূমিকা আছে। ‘আমি শতভাগ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি বিষয়টি। এটা সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি, দেশের অগ্রযাত্রার জন্য খুব দরকার, সবাই মিলেমিশে কাজ করা।’

ভোটে হারা প্রার্থী জয়ী প্রতিপক্ষের সৌজন্যকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এমন দৃশ্যও এ দেশের রাজনীতিতে খুব বেশি দেখা যায়নি।

দুই নেতার একই দিন, একই বার্তা
দিনটি আরও একটি কারণে চোখে পড়ার মতো। শারদীয় দুর্গোৎসবের মধ্যে দুই শিবিরের দুই শীর্ষ নেতাই চট্টগ্রামে সনাতন সম্প্রদায়ের পাশে ছিলেন।

হোটেল পেনিনসুলায় লোহাগাড়ার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তিনি তাঁদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানান। সেখানে ছিলেন সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীও।

সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে সরাসরি গেলেন রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল পূজামণ্ডপে। পথে সড়কের দুই পাশে দাঁড়ানো মানুষকে গাড়ি থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি।

দুই দল, দুই কর্মসূচি। কিন্তু দিনের বার্তা প্রায় এক: উৎসব সবার।

ওপরে করমর্দন, নিচে কাদা ছোড়া?
ফেসবুকে প্রতিক্রিয়ার বড় অংশই ইতিবাচক। সৈয়দ আবু তাহের লিখেছেন, পুরোনো রাজনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে হবে, মানুষ নতুন কিছু শিখতে চায়।

তবে কয়েকটি মন্তব্য একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে এনেছে। রাকিব আল রকি লিখেছেন, নেতারা এক, অথচ মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কাদা ছোড়াছুড়িতে মগ্ন। জাহাঙ্গীর আলমও প্রায় একই সুরে লিখেছেন, বড় নেতাদের মধ্যে সমস্যা নেই, যত সমস্যা গ্রামের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে।

এই মন্তব্যগুলোই হয়তো ছবিটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সৌজন্য বিমানবন্দরের সারিতে আটকে থাকলে চলবে না। তা পৌঁছাতে হবে ইউনিয়নের চায়ের দোকান পর্যন্ত, যেখানে দুই দলের কর্মীরা প্রতিদিন মুখোমুখি হন।

নাজমুল মোস্তফা আমিন যে কথাটি বলেছেন, সেটিই হয়তো পথ দেখায়। সবাই মিলেমিশে কাজ করা। নেতারা যে সৌজন্য দেখালেন, দলগুলো যদি তা কর্মীদের প্রশিক্ষণ আর আচরণবিধির অংশ করে, তবেই একটি ছবি একটি সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে।

সকালে নিজের নেতাকে ফুল দিয়েছিলেন। রাতে হাত বাড়ালেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে। মাঝখানে লম্বা একটা দিন। আর সেই দিনের শেষ ছবিটা এখন প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে সবার কাছে: এই হাত মেলানো কতদূর পৌঁছাবে?

 

সৌজন্যে : বাংলার পত্রিকা

আরও খবর