দেশের ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত, ঠিক তখনই ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (EBL) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে উঠেছে এক ভয়াবহ লুটপাটের অভিযোগ। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের অনলাইন পোর্টাল বাংলা আউটলুকে ডকুমেন্টসহ শওকত আলী চৌধুরীর নানা দুর্নীতি তুলে ধরেছেন।
অনুসন্ধান বলছে, সাধারণ গ্রাহকের আমানত রক্ষা করার দায়িত্ব যাঁর কাঁধে, তিনি নিজেই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত ‘এটিএম মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করে দেশ থেকে পাচার করেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অনুসন্ধানে ডিস্কো শওকত, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার বেশি সন্দেহজনক লেনদেন ও শেল কোম্পানির আড়ালে এলসি’র অপব্যবহার এবং বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক অভিযোগ পত্র থেকে এ তথ্য জানা যায়। গেল বছরের ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকা আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এই অভিযোগ পত্রটি দায়ের করেন।
একই সাথে গ্রাহকের এফডিআর একাউন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে ১১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী সহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে আদালত মামলার আবেদন গ্রহণ করে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানা যায়।

অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিএফআইইউ এর অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ২৮টি ব্যাংকে মোট ১৮৭টি হিসাব শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শওকত আলী চৌধুরীর নামে ১৪টি, তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীনের নামে ১৫টি, কন্যা জারা নামরীনের নামে ৯টি, ছেলে মো. জারান আলী চৌধুরীর নামে ৩টি হিসাব রয়েছে। এছাড়াও শওকত আলী চৌধুরীর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে ১৪৬টি ব্যাংক হিসাব।

গেল বছরের ১৫ই জুন পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জমা হয়। একই সময়ে হিসাবগুলোতে ১ হাজার ৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা স্থিতি ছিল বলে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের অভিযোগ সূত্রে বিএফআইইউ এর অনুসন্ধানে জানা যায়।
বিএফআইইউ-এর দাবি, এসব লেনদেনের সিংহভাগ’ই সন্দেহজনক।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শওকত আলী চৌধুরীর ঢাকা ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখায় পরিচালিত এক হিসাবে ৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এই হিসাব ব্যবহার করে তিনি তার প্রতিষ্ঠান এসএন কর্পোরেশনের লেনদেন পরিচালনা করেছেন, যা পরোক্ষভাবে ট্যাক্স ফাঁকির উদ্দেশ্যে করা হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএফআইইউ।

পরিবারের হিসাবেও অস্বাভাবিক জমা-উত্তোলন
অভিযোগ অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরীর মেয়ে জারা নামরীনের ইস্টার্ন ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ব্যক্তিগত হিসাবে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ৩১ কোটি টাকা জমা হয়, যা তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ছেলে জারান আলী চৌধুরীর মিডল্যান্ড ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবেও ট্রানজেকশন প্রোফাইলের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, আওয়ামী লীগের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে শওকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ.জ.ম. নাসির, শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম, চৌধুরী নাফিস শারাফাত, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ. আরাফাতসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

আরজেএসসি (যৌথমূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়) রেকর্ড অনুযায়ী, সিডনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির মালিক শওকত আলী চৌধুরী, নাফিস শারাফাত ও মোহাম্মদ এ. আরাফাত। এখানে শওকতের মালিকানাধীন জারান অফডক লিমিটেডের শেয়ার ৩০ শতাংশ, নাফিস শারাফাতের স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড এবি হাই টেক লিমিটেডের ৫০ শতাংশ এবং আরাফাতের আর ওয়েব ইন্টেলিজেন্স লিমিটেডের ২০ শতাংশ।

জাহাজ ভাঙার নামে এলসি, আসেনি জাহাজ
অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ি বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন এসএন কর্পোরেশনের পক্ষে ২০১২ সাল থেকে ১৪১টি এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি এলসি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট স্ক্র্যাপ ভেসেলগুলো আদৌ চট্টগ্রাম বন্দরকে শেষ গন্তব্য হিসেবে এসেছে কি না তার স্পষ্ট তথ্য নেই। কিছু ক্ষেত্রে লয়েড লিস্ট ইন্টেলিজেন্সে একই জাহাজের দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া বৃটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে একই ঠিকানায় নিবন্ধিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্ক্র্যাপ ভেসেল কেনার তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা এসব ক্ষেত্রে ‘এনহেন্সড ডিউ ডিলিজেন্স’ না করেই এলসি স্থাপন করেছে, যা গাইডলাইন্স ফর প্রিভেনশন অব ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিং ও ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে সম্পদ
অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী বিএফআইইউ সূত্র জানায়, শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরে ‘সেন্টোসা কোভ’ এর ‘দ্য কোস্ট’ প্রকল্পে দুটি অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এর একটি তিনি চলতি বছরের ২৯শে মে বিক্রি করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এফডিআর জালিয়াতিতে ১১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা
এদিকে এক গ্রাহকের এফডিআর একাউন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে ১১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে শওকত আলী চৌধুরীসহ ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরকার হাসান শাহরিয়ার অভিযোগ আমলে নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলার বাদী ব্যবসায়ী মো. মুর্তজা আলী অভিযোগ করেন, তার নামে জাল সঞ্চয়ী ও ঋণ হিসাব খুলে জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে এফডিআরের বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়। এতে ৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ এবং মোট পাওনা দাঁড়ায় ১১ কোটি টাকা।

আদালতের নাজির আবুল কালাম আজাদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার বাদী মো. মুর্তজা আলী একজন ব্যবসায়ী এবং ভাইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক। ২০১৭ সালে তিনি ইস্টার্ন ব্যাংক ও.আর নিজাম শাখায় পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকা সঞ্চয়ী হিসেবে জমা করেন। কিন্তু ব্যাংকের নিয়মনুযায়ী সঞ্চয়ী হিসাবের ওপর ৭শতাংশ মুনাফা পাওয়ার কথা থাকলেও ব্যাংক তা দেয়নি। পরে ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণ মুনাফাসহ ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা দাঁড়ালে মর্তুজা আলী সেই অর্থ ইস্টার্ন ব্যাংকের চান্দগাঁও শাখায় স্থানান্তর করেন।

২০১৭ ও ২০১৮ সালে মর্তুজা আলী ইস্টার্ন ব্যাংকের চান্দগাঁও শাখায় ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকার ছয়টি এফডিআর (স্থায়ী আমানত) খোলেন এবং এর বিপরীতে একটি ওএসডি (সিকিউরড ওভারড্রাফট) ঋণের জন্য আবেদন করেন। ২০১৯ সালে বিদেশে থাকার সময় তিনি ব্যাংকটির চান্দগাঁও শাখায় তার নামে দুটি জাল সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট ও চারটি জাল ঋণ অ্যাকাউন্টের বিষয়ে জানতে পারেন। তার জাল স্বাক্ষর ও ভুল তথ্য দিয়ে ওই অ্যাকাউন্ট দিয়ে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৭ টাকা লেনদেন করে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বাদী তার সকল পাওনা বুঝে পেতে ইস্টার্ন ব্যাংক বরাবর লিখিত আইনি নোটিশ পাঠালেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মর্তুজা আলীর ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে সব মিলিয়ে ১১ কোটি পাওনা বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ‘ডিস্কো শওকত’ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি তিনি ফিনলে প্রপার্টিজ-এর পরিচালক ও অংশীদার। যার অধীনে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রচুর জমি ক্রয় করেছেন। যা প্রপার্টিজ আইনও অতিক্রম করেছে বলেও অভিযোগ আছে। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে এন এন করপোরেশন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিকও তিনি।

এফডিআর জালিয়াতিসহ অনিয়ম-দুর্নীতি সর্ম্পকে জানতে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী ওরফে ‘ডিস্কো শওকত’ বলেন, ৮ হাজার ৪শ কোটি লেনদেনের বিষয়টি আয়কর নথিতে উল্লেখ আছে। আর মেয়ের হিসাবের টাকার অংশটিা তিনি মেয়েকে গিফট করেছেন সেটিও আয়কর নথিতে আছে।

এফডিআর জালিয়াতিতে ব্যাংকের কর্মকর্তা জড়িত, ব্যাংক দুদকে মামলা করলে সেই কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছেন। জাহাজ না এনে টাকা পাচারের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, জাহাজ না এনে টাকা পাচারের সুযোগ নেই। বিষয়টি সকারের বেশ কিছু সংস্থা বিষয়টি তদারকি করে।

আরও খবর